Chapter (অধ্যায়): দক্ষিণেশ্বর কালীবাটী পৃষ্ঠা ৩৯Page: 39 of 234
যশস্বিনী হয়েন নাই, কিন্তু তাঁহার ঈশ্বর বিশ্বাস, ওজস্বিতা * এবং দরিদ্রদিগের প্রতি নিরন্তর সহানুভূতি**, তাঁহার অজস্র দান, অকাতর অন্নব্যয় প্রভৃতি অনুষ্ঠান সমূহ তাঁহাকে সকলের বিশেষ প্রিয় করিয়া তুলিয়াছিল। বাস্তবিক নিজ গুণ ও কর্মে এই রমণী তখন আপন ‘রানী’ নাম সার্থক করিতে এবং ব্রাহ্মণেতর নির্বিশেষে সকল জাতির হৃদয়ের শ্রদ্ধা ও ভক্তি সর্বপ্রকারে আকর্ষণে সক্ষম হইয়াছিলেন। আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, তখন রানীর কন্যাগনের বিবাহ ও সন্তান সন্ততি হইয়াছ; এবং একটি মাত্র পুত্র রাখিয়া রানীর তৃতীয়া কন্যার মৃত্যু হওয়ায় প্রিয়দর্শন তৃতীয় জামাতা শ্রীযুক্ত মথুরমোহন বা মথরানাথ বিশ্বাস ঐ ঘটনায় পর হইয়া যাইবেন ভাবিয়া, রানী তাঁহার চতুর্থ কন্যা শ্রীমতী জগদম্বা দাসীর বিবাহ উক্ত
*শুনা যায়, রানী রাসমণির জানবাজারের বাটীতে নিকট পূর্বে ইংরাজ সৈনিকদিগের একটি ব্যারাক বা আড্ডা প্রতিষ্ঠিত ছিল। মদ্যপানে উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকেরা একদিন রানীর দ্বাররক্ষক দিগকে বল প্রয়োগে বশীভূত করিয়া বাটীমধ্যে প্রবেশ ও লুটপাট করিতে আরম্ভ করে। রানীর জামাতা মথুর বাবু প্রমুখ পুরুষেরা তখন কার্যান্তরে বাহিরে গিয়াছিলেন। সৈনিকেরা বাদা না পাইয়া ক্রমে অন্দরে প্রবেশ করিতে উদ্যত দেখিয়া রানী স্বয়ং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জতি হইয়া তাহাদিগের বাধা দিবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছিলেন।
**কথিত আছে, গঙ্গায় মৎস্য ধরিবার জন্য ধীবর দিগের উপর ইংরাজ রাজসরকার একবার কর বসাইয়াছিলেন। ঐ ধীবর দিগের অনেকে রানীর জমিদারিতে বাস করিত। করের দায়ে উৎপীড়িত হইয়া তাহারা রানীর নিকট আপনাদের দুঃখ-কষ্টের কথা নিবেদন করে। রানী শুনিয়া তাহাদিগকে অভয় দিলেন এবং বহু অর্থ দিয়া সরকার বাহাদুরের নিকট হইতে গঙ্গায় মৎস্য ধরিবার ইজারা লইলেন। সরকার বাহাদুর রানী মৎস্য ব্যবসায় করিবেন ভাবিয়া উক্ত অধিকার প্রদান করিবামাত্র গঙ্গার কয়েক স্থল এক কূল হইতে অন্য কূল পর্যন্ত রানী এমন শৃঙ্খলিত করিলেন যে, ইংরাজদের জলযান সমূহের নদীমধ্যে প্রবেশপথ প্রায় রুদ্ধ হইয়া যাইল। তাঁহার তখন রানীর ঐ কার্যের প্রতিবাদ করিলে রানী বলিয়া পাঠাইলেন, “আমি অনেক অর্থব্যয়ে নদীতে মৎস্য ধরিবার অধিকার আপনাদের নিকট হইতে ক্রয় করিয়াছি, সেই অধিকার-সূত্রেই ঐরূপ করিয়াছি। ঐরূপ করিবার কারণ, নদী মধ্য দিয়া জলযানাদি নিরন্তর গমনাগমন করিলে মৎস্য সকল অন্যত্র পলায়ান করিবে এবং আমার সমূহ ক্ষতি হইবে; অএতব নদী গর্ভ শৃঙ্খলমুক্ত কেমন করিয়া করিব। তবে যদি আপনারা নদীতে মৎস্য ধরিবার নূতন কর উঠাইয়া দিতে রাজি হন, তবে আমিও আমার অধিকার স্বত্ব স্বেচ্ছায় ত্যাগ করিতে স্বীকৃতা আছি। নতুবা ঐ বিষয় লইয়া মকদ্দমা উপস্থিত হইবে এবং সরকার বাহাদুরকে আমার ক্ষতিপূরণে বাধ্য হইতে হইবে।’’ শুনা যায়, রানীর ঐরূপ যক্তিযুক্ত কথায় এবং গরীব ধীবরদিগকে রক্ষা করিবার জন্যই রানী ঐরূপ করিতেছেন, একথা হৃদয়ঙ্গম করিয়া সরকার বাহাদুর ঐ কর অল্প দিন বাদেই উঠাইয়া দেন এবং ধীবরেরা পূর্বের ন্যায় বিনা করে যথা ইচ্ছা মৎস্য ধরিয়া রানীকে আশীর্বাদ করিতে থাকে।
লোকহিতকর কার্যে রানী রাসমণির উৎসাহ সর্বদা পরিতলক্ষিত হইত। “সোনাই বেলেঘাটা ও ভবানীপুরে। বাজার; কালীঘাটে ঘাট ও মুমূর্ষু –নিবাস; হালিসহরে জাহ্নবীতীরে ঘাট ও সুবর্ণরেখার অপর তীর হইতে কিছুদূর পর্যন্ত শ্রীক্ষেত্রের রাস্তা প্রভৃতিতে তাহার পরিচয় পাওয়া যায়। গঙ্গাসাগর, ত্রিবেণী, নবদ্বীপ, অগ্রদ্বীপ ও পুরীতে তীর্থযাত্রা করিয়া রাসমণি দেবোদ্দেশে প্রচুর অর্থব্যয় করেন।” তদ্ভিন্ন মকিমপুর জমিদারির প্রজাগণকে নীলকরের অত্যাচার হইতে রক্ষা করা এবং দশসহস্র মুদ্রা ব্যয়ে টোনার খাল খনন করাইয়া মধুমতীর সহিত নবগঙ্গা্র সংযোগবিধান করা প্রভৃতি নানা সৎকার্য রানী রাসমণীর দ্বারা অনুষ্ঠিত হইয়াছিল।

