Chapter (অধ্যায়): দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ পৃষ্ঠা ৬৯৬Page: 696 of 1170


করিয়া, বীজমন্ত্র জপিয়া, নামগানকরিতেছেন। ঘরের বাহিরে অপূর্ব শোভা! কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথি। বিমল চন্দ্রকিরণে একদিকেঠাকুরবাড়ি হাসিতেছে, আর-একদিকে ভাগীরথীবক্ষ সুপ্ত শিশুর বক্ষের ন্যায় ঈষৎ বিকম্পিত হইতেছে। জোয়ার পূর্ণহইয়া আসিল। আরতির শব্দ গঙ্গার স্নিগ্ধোজ্জ্বল প্রবাহসমুদ্ভূত কলকলনাদ সঙ্গে মিলিত হইয়া বহুদূর পর্যন্ত গমনকরিয়া লয়প্রাপ্ত হইতেছিল। ঠাকুরবাড়িতে এককালে তিন মন্দিরে আরতি - কালীমন্দিরে, বিষ্ণুমন্দিরে ওশিবমন্দিরে। দ্বাদশ শিবমন্দিরে এক-একটি করিয়া শিবলিঙ্গের আরতি। পুরোহিত শিবের একঘর হইতেআর-একঘরে যাইতেছেন। বাম হস্তে ঘণ্টা, দক্ষিণ হস্তে পঞ্চপ্রদীপ, সঙ্গে পরিচারক - তাহার হস্তে কাঁসর। আরতিহইতেছে, তৎসঙ্গে ঠাকুরবাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ হইতে রোশনচৌকির সুমধুর নিনাদ শুনা যাইতেছে। সেখানেনহবতখানা, সন্ধ্যাকালীন রাগরাগিণী বাজিতেছে। আনন্দময়ীর নিত্য উৎসব - যেন জীবকে স্মরণ করাইয়া দিতেছে- কেহ নিরানন্দ হইও না - ঐহিকের সুখ-দুঃখ আছেই; থাকে থাকুক - জগদম্বা আছেন। আমাদের মা আছেন!আনন্দ কর! দাসীপুত্র ভাল খেতে পায় না, ভাল পরতে পায় না, বাড়ি নাই ঘর নাই, - তবু বুকে জোর আছে; তার যেমা আছে। মার কোলে নির্ভর। পাতানো মা নয়, সত্যকার মা। আমি কে, কোথা থেকে এলাম, আমার কি হবে, আমিকোথায় জাব, সব মা জানেন। কে অত ভাবে! আমার মা জানেন - আমার মা, যিনি দেহ, মন, প্রাণ, আত্মা দিয়েআমায় গড়েছেন। আমি জানতেও চাই না। যদি জানবার দরকার হয় তিনি জানিয়ে দিবেন। অত কে ভাবে? মায়েরছেলেরা সব আনন্দ কর!

        বাহিরে কৌমুদীপ্লাবিত জগৎ হাসিতেছে; কক্ষমধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ হরিপ্রেমানন্দে বসিয়া আছেন। ঈশানকলিকাতা হইতে আসিয়াছেন, আবার ইশ্বরীয় কথা হইতেছে। ঈশানের ভারী বিশ্বাস। বলেন, একবার যিনি দুর্গানামকরে বাড়ি থেকে যাত্রা করেন, তাঁর সঙ্গে শূলপাণি শূলহস্তে যান। বিপদে ভয় কি? শিব নিজে রক্ষা করেন।

[বিশ্বাসে ঈশ্বরলাভ - ঈশানকে কর্মযোগ উপদেশ]

        শ্রীরামকৃষ্ণ (ঈশানের প্রতি) - তোমার খুব বিশ্বাস - আমাদের কিন্তু অত নাই। (সকলের হাস্য) বিশ্বাসেইতাঁকে পাওয়া যায়।

        ঈশান - আজ্ঞা হাঁ।

        শ্রীরামকৃষ্ণ - তুমি জপ, আহ্নিক, উপবাস, পুরশ্চরণ - এই সব কর্ম করছ তা বেশ। যার আন্তরিক ঈশ্বরেরউপর টান থাকে, তাকে দিয়ে তিনি এই সব কর্ম করিয়ে লন। ফলকামনা না করে এই সব কর্ম করে জেতে পারলেনিশ্চিত তাঁকে লাভ হয়।

[বৈধীভক্তি ও রাগভক্তি - কর্মত্যাগ কখন?]

        “শাস্ত্র অনেক কর্ম করতে বলে গেছে - তাই করছি; এরূপ ভক্তিকে বৈধীভক্তি বলে। আর-এক আছে, রাগভক্তি।সেটি অনুরাগ থেকে হয়, ঈশ্বরে ভালবাসা থেকে হয় - যেমন প্রহ্লাদের। সে ভক্তি যদি আসে, আর বৈধী কর্মের প্রয়োজন হয় না।”

 



Foot Note: