Chapter (অধ্যায়): সংসারে ও ঠাকুরের নিকটে নরেন্দ্রনাথের শিক্ষা পৃষ্ঠা-১২১Page: 121 of 203
ভাবিলাম— ভালই হইল, গুরুদৰ্শন করিয়া চিরকালের মতো গৃহ ত্যাগ করিব । ঠাকুরের সহিত সাক্ষাৎ হইবামাত্র তিনি ধরিয়া বসিলেন, “তোকে আজ আমার সহিত দক্ষিণেশ্বরে যাইতে হইবে। নানা ওজর করিলাম। তিনি কিছুতেই ছাড়িলেন না। অগত্যা তাঁহার সঙ্গে চলিলাম। গাড়িতে তাঁহার সহিত বিশেষ কোন কথা হইল না। দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছিয়া অন্য সকলের সহিত কিছুক্ষণ তাঁহার গৃহমধ্যে উপবিষ্ট রহিয়াছি এমন সময়ে ঠাকুরের ভাবাবেশ হইল। দেখিতে দেখিতে তিনি সহসা নিকটে আসিয়া আমাকে সস্নেহে ধারণপূর্বক সজল নয়নে গাহিতে লাগিলেন—
কথা কহিতে ডরাই,
না কহিতেও ডরাই,
(আমার) মনে সন্দ হয়
বুঝি তোমায় হারাই, হা— রাই!
|
ঠাকুরের অনুরোধে নিরুদ্দেশ হইবার সঙ্কল্প পরিত্যাগ |
“অন্তরের প্রবল ভাবরাশি এতক্ষণ সযত্নে রুদ্ধ রাখিয়াছিলাম, আর বেগ সংবরণ করিতে পারিলাম না— ঠাকুরের ন্যায় আমারও বক্ষ নয়নধারায় প্লাবিত হইতে লাগিল। নিশ্চয় বুঝিলাম, ঠাকুর সকল কথা জানিতে পারিয়াছেন! আমাদিগের ঐরূপ আচরণে অন্য সকলে স্তম্ভিত হইয়া রহিল। প্রকৃতিস্থ হইবার পরে কেহ কেহ ঠাকুরকে উহার কারণ জিজ্ঞাসা করায় তিনি ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিলেন, ‘আমাদের ও একটা হয়ে গেল।‘ পরে রাত্রে অপর সকলকে সরাইয়া আমাকে নিকটে ডাকিয়া বলিলেন, “জানি আমি, তুমি মার কাজের জন্য আসিয়াছ, সংসারে কখনই থাকিতে পারিবে না, কিন্তু আমি যতদিন আছি ততদিন আমার জন্য থাক!'— বলিয়াই ঠাকুর হৃদয়ের আবেগে রুদ্ধকণ্ঠে, পুনরায় অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন!
|
দৈব সহায়তায় দারিদ্র্যমোচনের সঙ্কল্প ও সেজন্য ঠাকুরকে জেদ করায়, তাঁহার 'কালীঘর'-এ যাইয়া প্রার্থনা করিতে বলা |
“ঠাকুরের নিকটে বিদায় গ্রহণ করিয়া পরদিন বাটীতে ফিরিলাম, সঙ্গে সঙ্গে সংসারের শতচিন্তা আসিয়া অন্তর অধিকার করিল। পূর্বের ন্যায় নানা চেষ্টায় ফিরিতে লাগিলাম। ফলে ‘এটর্নির আফিসে পরিশ্রম করিয়া এবং কয়েকখানি পুস্তকের অনুবাদ প্রভৃতিতে সামান্য উপার্জন হইয়া কোনরূপে দিন কাটিয়া যাইতে লাগিল বটে, কিন্তু স্থায়ী কোনরূপ কর্ম জুটিল না এবং মাতা ও ভ্রাতাদিগের ভরণ-পোষণের একটা সচ্ছল বন্দোবস্তও হইয়া উঠিল না। কিছুকাল পরে মনে হইল, ঠাকুরের কথা তো ঈশ্বর শুনেন— তাঁহাকে অনুরোধ করিয়া মাতা ও ভ্রাতাদিগের খাওয়া-পরার কষ্ট যাহাতে দুর হয় এরূপ প্রার্থনা করাইয়া লইব ; আমার জন্য ঐরূপ করিতে তিনি কখনই অস্বীকার করিবেন না। দক্ষিণেশ্বরে ছুটিলাম এবং নাছোড়বান্দা হইয়া ঠাকুরকে ধরিয়া বসিলাম, ‘মা-ভাইদের আর্থিক কষ্ট নিবারণের জন্য আপনাকে মাকে জানাইতে হইবে। ঠাকুর বলিলেন, “ওরে, আমি যে এসব কথা বলতে পারি না। তুই যা না কেন ? মাকে মানিস না— সেইজন্যই তোর এত কষ্ট! বলিলাম, 'আমি তো মাকে জানি না, আপনি আমার জন্য মাকে বলুন— বলতেই হবে, আমি কিছুতেই আপনাকে ছাড়ব না।' ঠাকুর সস্নেহে বলিলেন, “ওরে, আমি যে কতবার বলেছি, মা, নরেন্দ্রের দুঃখ কষ্ট দূর কর; তুই

