Chapter (অধ্যায়): ঠাকুরের পরীক্ষাপ্রণালী ও নরেন্দ্রনাথ পৃষ্ঠা-৯৫Page: 95 of 203
|
দৈনিক সামান্য কাৰ্যসকল লক্ষ্য করিয়া বিভিন্ন ব্যক্তিকে উপদেশ প্রদান |
নিরঞ্জনকে অধিক পরিমাণে ঘৃত ভোজন করিতে দেখিয়া বলিয়াছিলেন, “অত ঘি খাওয়া শেষে কি লোকের ঝি বউ বার করবি ?” জনৈক অধিক নিদ্রা যাইত বলিয়া কিছুকাল ঠাকুরের অসন্তোষভাজন হইয়াছিল। চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের ঝোঁকে পড়িয়া জনৈক তাহার নিষেধ অবহেলা করায় বলিয়াছিলেন, “কোথায় একে একে বাসনা ত্যাগ করিবি তাহা নহে, বাসনা-জালের বৃদ্ধি করিতেছিস, তাহা হইলে আধ্যাত্মিক উন্নতিলাভ আর কেমন করিয়া হইবে ?” প্রসঙ্গান্তরে ঐরূপ অনেক দৃষ্টান্ত আমরা ইতঃপূর্বে সময়ে সময়ে পাঠকের নয়নগোচর করিয়াছি, সুতরাং ঐ বিষয়ে অধিক কথা এখানে বলা নিষ্প্রয়োজন।
আশ্রিত ব্যক্তিগণের স্বাভাবিক প্রকৃতি পূর্বোক্ত উপায়সকলের সহায়ে পরিজ্ঞাত হইয়া উহার দোষভাগ ধীরে ধীরে পরিবর্তনের চেষ্টামাত্র করিয়া ঠাকুর ক্ষান্ত হইতেন না— কিন্তু ঐ উদ্দেশ্য কতদূর সংসিদ্ধ হইল তদ্বিষয় বারংবার অনুসন্ধান করিতেন। তদ্ভিন্ন ঐরূপ কোন ব্যক্তির আধ্যাত্মিক উন্নতির পরিমাণ করিবার জন্য তাঁহাকে এক বিশেষ উপায় সর্বদা অবলম্বন করিতে দেখা যাইত। উপায়টি ইহাই:
| (৪) তাঁহাতে সর্বশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক প্রকাশ উপলব্ধি করিবার দিকে ব্যক্তিবিশেষ কতদূর অগ্রসর হইতেছে ঠাকুরের তাহা লক্ষ করা |
৪র্থ— ব্যক্তিবিশেষ তাঁহার নিকটে প্রথম আসিবার কালে যে শ্রদ্ধা বা ভক্তিভাবের প্রেরণায় উপস্থিত হইত, সেই ভাবটি দিন দিন বর্ধিত হইতেছে কি না তদ্বিষয় অনুসন্ধান করা ঠাকুরের রীতি ছিল । ঐ বিষয় জানিবার জন্য তিনি কখন কখনও নিজ আধ্যাত্মিক অবস্থা বা আচরণবিশেষের সম্বন্ধে ঐ ব্যক্তি কতদুর কিরূপ বুঝিতেছে তাহা জিজ্ঞাসা করিতেন, কখনও বা তাঁহার সকল কথায় সে সম্পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে কি না তাহা লক্ষ্য করিতেন, আবার কখনও বা নিজ সঙ্ঘমধ্যস্থ যে-সকল ব্যক্তির সহিত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে মিলিত হইলে তাহার ভাব গভীরতা প্রাপ্ত হইবে, তাহাদিগের সহিত তাহার পরিচয় করাইয়া দেওয়া প্রভৃতি নানা উপায়ে তাহাকে সহায়তা করিতেন। ঐরূপে যতদিন না ঐ ব্যক্তি অন্তরের স্বাভাবিক প্রেরণায় তাঁহাকে জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক আদর্শের প্রকাশ বলিয়া গ্রহণ করিতে সমর্থ হইত ততদিন পর্যন্ত তিনি তাহার ধর্মলাভ সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হইতে পারিতেন না।
|
শেষোক্ত উপায়ের দ্বারা ব্যক্তিবিশেষের আধ্যাত্মিক উন্নতির পরিমাণ নির্ণয় ঠাকুরের পক্ষে স্বাভাবিক কেন |
পূর্বোক্ত কথাগুলিতে পাঠক বিস্মিত হইবেন সন্দেহ নাই। কিন্তু স্বল্প চিন্তার ফলে বুঝিতে পারা যায় উহাতে বিস্ময়ের কারণ যে কিছুমাত্র নাই তাহা নহে, কিন্তু ঐরূপ করাই ঠাকুরের পক্ষে নিতান্ত যুক্তিযুক্ত ও স্বাভাবিক ছিল। বুঝিতে পারা যায়, তিনি আপনাতে অদৃষ্টপূর্ব আধ্যাত্মিকতাপ্রকাশের কথা সত্য সত্যই জানিতে পারিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার ঐরূপ আচরণ করা ভিন্ন উপায়ান্তর ছিল না। 'লীলাপ্রসঙ্গ’-এর অন্যত্র আমরা পাঠককে বুঝাইতে প্রয়াস পাইয়াছি, দীর্ঘকালব্যাপী অলৌকিক তপস্যা ও ধ্যানসমাধি সহায়ে ঠাকুরের অন্তরে অভিমান-অহঙ্কার সর্বথা বিনষ্ট হইয়া যখন তাঁহাতে ভ্রমপ্রমাদের সম্ভাবনা এককালে তিরোহিত হইয়াছিল তখন অখণ্ড স্মৃতি ও অনন্ত জ্ঞানপ্রকাশ উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে প্রাণে প্রাণে

