Chapter (অধ্যায়): হিন্দুধর্ম পৃষ্ঠা ১৯Page: 19 of 320
দেবালয়ের পাশে দাড়িয়ে যদি কেউ শোনে, তা হলে শুনতে পাবে, পূজক দেববিগ্রহে ঈশ্বরের সমুদয় গুণ, এমন কি সর্বব্যাপিত্ব পর্যন্ত আরোপ করেছে। এটা বহু-ঈশ্বরবাদ নয়, বা এটাকে কোনদেব-বিশেষের প্রাধান্যবাদ বললেও প্রকৃত ব্যাপার ব্যাখ্যা হবে না। গোলাপকে যে-কোন অন্য নামই দাও না কেন, তার সুগন্ধ সমানই থাকবে। সংজ্ঞা বা নাম দিলেই ব্যাখ্যা করা হয় না।
মনে পড়ে বাল্যকালে একদা এক খ্রীষ্টান পাদ্রীকে ভারতে এক ভিড়ের মধ্যে বক্তৃতা করতে শুনেছিলাম। নানাবিধ মধুর কথা বলতে বলতে তিনি বলে উঠলেন, ‘আমি যদি তোমাদের বিগ্রহ-পুতুলকে এই লাঠি দিয়ে আঘাত করি, তবে সেটা আমার কি করতে পারে?’ জনতার মধ্যে থেকে একজন বলল, ‘আমি যদি তোমার ভগবানকে গালাগালি দিই, তিনিই বা আমার কি করতে পারেন?’ পাদ্রী উত্তর দিলেন, ‘মৃত্যুর পর তোমার শাস্তি হবে।’ সেই ব্যক্তিও বলল, ‘তুমি মরার পর আমার দেবতাও তোমাকে শাস্তি দেবেন।’
ফলেই বৃক্ষের পরিচয়। যখন দেখি যে যাদেরকে পৌত্তলিক বলা হয়, তাদের মধ্যে এমন সব মানুষ আছেন, যাদের মতো নীতিজ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও প্রেম কখনও কোথাও দেখি নি, তখন মনে এই প্রশ্ন উদিত হয় পাপ থেকে কি কখনও পবিত্রতা জন্মাতে পারে?
কুসংস্কার মানুষের শত্রু বটে, কিন্তু ধর্মান্ধতা আরও খারাপ। খ্রীষ্টানরা কেন গির্জায় যান? ক্রুশই বা এত পবিত্র কেন? প্রার্থনার সময় কেন আকাশের দিকে তাকানো হয়? ক্যাথলিকদের গির্জায় এত মূর্তি রয়েছে কেন? প্রোটেষ্টান্টেদের মনে প্রার্থনাকালে এত ভাবময় রূপের আর্বিভাব হয় কেন ? হে আমার ভ্রাতৃবৃন্দ, নিঃশ্বাস গ্রহণ না করে জীবনধারণ করা যেমন অসম্ভব, চিন্তাকালে মনোময় রূপ বিশেষের সাহায্য না নেওয়াও আমাদের পক্ষে সেইরূপ অসম্ভব। ভাবানুষঙ্গনিয়মানুসারে জড়মূর্তি দেখলে মানসিক ভাববিশেষের উদ্দীপন হয়, বিপরীতক্রমে মনে ভাববিশেষের উদ্দীপন হলে তদনুরূপ মূর্তিবিশেষও মনে উদিত হয়। এইজন্য হিন্দু উপাসনার সময়ে বাহ্য প্রতীক ব্যবহার করে। সে বলবে, তার উপাস্য দেবতায় মন স্থির করতে প্রতীক সাহায্য করে। সে তোমাদেরই মতো জানে, প্রতিমা ঈশ্বর নয়, সর্বব্যাপী নয়। আচ্ছা বলতো, ‘সর্বব্যাপী’ বলতে অধিকাংশ মানুষ-প্রকৃতপক্ষে সারা পৃথিবীর মানুষ কি বুঝিয়ে থাকে? এটা একটি শব্দমাত্র-একটি প্রতীক। ঈশ্বরের কি বিস্তৃতি আছে? তা যদি না থাকে, তবে ‘সর্বব্যাপী’ শব্দটি আবৃত্তি করলে আমাদের মনে বড়জোর বিস্তৃত আকাশ অথবা মহাশূন্যের কথাই উদিত হয়, এই পর্যন্ত।
দেখা যাচ্ছে-যেভাবেই হোক-মানুষের মনের গঠনানুসারে অনন্তের ধারণা অনন্ত নীলাকাশ বা সমুদ্রের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে জড়িত; সেজন্য আমরা স্বভাবতই পবিত্রতার ধারণা গির্জা, মসজিদ বা ক্রুশের সঙ্গে যুক্ত করে থাকি। হিন্দুরা পবিত্রতা, সত্য, সর্বব্যাপিত্ব প্রভৃতি ভাবগুলি বিভিন্ন মূর্তি ও প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত

