Chapter (অধ্যায়): কর্তব্য কি? পৃষ্ঠা ৭০Page: 70 of 320
কারণ এই কুসংস্কার-সঞ্জাত। এর দ্বারা মানুষের প্রতি মানুষের সৌহার্দ্য নষ্ট হয়। যে ব্যক্তি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন-আমি তাঁর মতো পোশাক পরি না কেন, এবং আমার বেশের জন্য আমার সঙ্গে অসদ্ব্যবহার করতে চাইলেন, তিনি হয়তো খুব ভালো লোক; হয়তো তিনি সন্তানবৎসল পিতা ও একজন সজ্জন ব্যক্তি; কিন্তু যখনই তিনি ভিন্নবেশপরিহিত কাউকে দেখলেন, তখনই তাঁর স্বাভাবিক সহৃদয়তা লুপ্ত হয়ে গেল। সকল দেশেই আগন্তুক বিদেশীদের শোষণ করা হয়, কারণ তারা যে জানে না, নতুন অবস্থায় পড়ে কি ভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়, এইজন্য তারাও ঐ দেশের লোকেদের সম্বন্ধে একটা ভুল ধারণা নিয়ে যায়। নাবিক, সৈন্য ও বণিকগণ বিদেশে অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যবহার করে থাকে, নিজেদের দেশে ঐরূপ করবার কথা তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। এই কারণেই বোধ হয় চীনারা ইওরোপীয় ও মার্কিনগণকে ‘বিদেশী শয়তান’ বলে থাকে। পাশ্চাত্য জীবনের ভাল দিকগুলি দেখলে তারা এরকম বলতে পারত না।
সুতরাং একটি বিষয় আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, আমরা যেন অপরের কর্তব্য বিচার করতে গিয়ে তাদেরই চোখ দিয়ে দেখি,যেন অপর জাতির আচার-ব্যবহার আমাদের নিজেদের মাপকাঠি দিয়ে মাপতে না যাই। আমি বিশ্বজগতের মাপকাঠি নই। আমার ভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে চলতে হবে। গোটাজগৎ কখনও আমার ভাবের সঙ্গে মিলে মিশে চলবে না। অতএব দেখেছি,পরিবেশ অনুসারে আমাদের কর্তব্যের ধারা পরিবর্তিত হয়; কোন বিশেষ সময়ে যা আমাদের কর্তব্য,তা করাই এ জগতের শ্রেষ্ঠ কর্ম। প্রথমেই যেন আমরা আমাদের জন্মপ্রাপ্ত কর্তব্য অনুসারে কাজ করি; তারপর সমাজে ও জীবনে আমাদের পদমর্যাদা অনুসারে যা কর্তব্য, তা করতে হবে। মানুষের-স্বভাবের একটি বিশেষ দুর্বলতা এই যে,মানুষ কখনই নিজেকে পরীক্ষা করে না। সে মনে করে,সেও রাজার মত সিংহাসনে বসবার উপযুক্ত। যদি বা সে উপযুক্ত হয়, তবু তাকে আগে দেখাতে হবে, সে তার সামাজিক অবস্থা অনুযায়ী কর্তব্য সম্পন্ন করেছে। তবেই তার উপর উচ্চতর কর্তব্যের ভার অর্পিত হবে। এ সংসারে যখন আমরা আগ্রহ সহকারে কাজ করতে আরম্ভ করি, তখন প্রকৃতিই আমাদেরকে চারিদিক থেকে আঘাত করে, তারই সাহায্যে শীঘ্রই আমরা আমাদের যথার্থ মর্যাদা খুঁজে পাই, বুঝতে পারি-কোথায় কার স্থান। যে যে-কার্যের উপযুক্ত নয়, সে দীর্ঘকাল সন্তোষজনকভাবে সেই পদে থাকতে পারে না। সুতরাং প্রকৃতি যেরূপ বিধান করে, এটার বিরুদ্ধে বিরক্তি প্রকাশ করে কোন ফল নেই। ছোট কাজ করেছে বলেই যে একজন নিম্নস্তরের মানুষ, তা নয়। শুধু কর্তব্যের প্রকৃতি দেখে কারুরও বিচার করা উচিত নয়; যে যেভাবে সেই কর্তব্য নিষ্পন্ন করে, তার দ্বারাই তার বিচার করতে হবে।
পরে আমরা দেখব, কর্তব্যের এই ধারণাও পরিবর্তিত হয়; আরও দেখব-যখন কর্মের পিছনে স্বার্থপ্রেরণা থাকে না, তখনই মানুষ শ্রেষ্ঠ কর্ম করতে পারে।

