Chapter (অধ্যায়): কর্মজীবনে বেদান্ত (দ্বিতীয় প্রস্তাব) পৃষ্ঠা - ১৯১Page: 191 of 389


—তুমি স্ত্রী, তুমি পুরুষ, তুমি বালক, তুমি বালিকা, তুমি বৃদ্ধ লাঠিতে ভর দিয়ে বেড়াচ্ছ, তুমিই জগতে জন্মগ্রহণ করছ। তুমি এই সব। কি অদ্ভুত জীবন্ত ঈশ্বর! জগতের মধ্যে তিনিই একমাত্র বস্তু—এটা অনেকের পক্ষে ভয়ানক বলে বোধ হয়; বাস্তবে এটা প্রচলিত ঈশ্বর-ধারণার বিরোধী বটে; সেই ঈশ্বর কোন বিশেষ স্থানে কোন আবরণের পেছনে লুকিয়ে রয়েছেন, তাঁকে কেউই কখনও দেখতে পায় না। পুরোহিতরা আমাদেরকে কেবল এই আশ্বাস দেন যে, যদি আমরা তাঁদের কথা শুনে চলি, তাঁদের পদধূলি গ্রহণ করি এবং তাঁদেরকে পুজো করি, তা হলে আমরা এই জীবনে ঈশ্বরকে দেখব না বটে, কিন্তু মৃত্যুর সময় তারা  আমাদেরকে একটি ছাড়পত্র দেবেন—তখন আমরা ঈশ্বর দর্শন করতে পারব! এ কথা বেশ বুঝতে পারা যায়—এই স্বর্গবাদ প্রভৃতি পুরোহিতদের মূর্খতা ছাড়া আর কি?

অবশ্য নির্গুনবাদ অনেক কিছু ভেঙে ফেলে, তা পুরোহিতদের কাছ থেকে সব ব্যবসা কেড়ে নেয়—তাতে মন্দির গির্জা প্রভৃতি সব উড়ে যায়। ভারতে এখন দুর্ভিক্ষ চলছে, কিন্তু সেখানে এমন অনেক মন্দির আছে, যাতে অসংখ্য হীরে জহরত রয়েছে। যদি লোককে এই নির্গুন ব্রহ্মের বিষয় শেখানো যায়, পুরোহিতদের ব্যবসা চলে যাবে। তবু আমাদেরকে পৌরোহিত্য ছেড়ে নিঃস্বার্থভাবে শেখাতে হবে। তুমিও ঈশ্বর, আমিও ঈশ্বর—তবে কে কার আজ্ঞা পালন করবে? কে কার উপাসনা করবে? তুমিই ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দির; আমি কোন মন্দিরে কোন প্রতিমা বা কোন শাস্ত্র উপাসনা না করে বরং তোমার উপাসনা করব। লোকে এত পরস্পর-বিরোধী চিন্তা করে কেন? লোকে বলে, আমরা প্রত্যক্ষবাদী; বেশ কথা, কিন্তু এইখানে তোমার উপাসনার থেকে আর কি বেশি প্রত্যক্ষ থেকে পারে? আমি তোমাকে দেখছিলাম, তোমাকে বেশ অনুভব করছি, আর জানছি—তুমি ঈশ্বর। মুসলমানেরা বলেন, আল্লা ছাড়া ঈশ্বর নেই ; কিন্তু বেদান্ত বলেন, মানুষ ছাড়া ঈশ্বর নেই । এটা শুনে তোমাদের অনেকের ভয় থেকে পারে, কিন্তু তোমরা ক্রমশ তা বুঝবে। জীবন্ত ঈশ্বর তোমাদের সঙ্গে রয়েছেন, তবুও তোমরা মন্দির-গির্জা নির্মাণ করছ, আর সবরকম কাল্পনিক মিথ্যা বস্তুতে বিশ্বাস করছ। মানব আত্মা অথবা মানবদেহই একমাত্র উপাস্য ঈশ্বর। অবশ্য অন্য জীবজন্তুরাও ভগবানের মন্দির বটে, কিন্তু মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দির—মন্দিরের মধ্যে তাজমহল। যদি মানুষের মধ্যে তাঁর উপাসনা করতে না পারলাম, তবে কোন মন্দিরেই কিছু উপকার হবে না। যে-মুহূর্তে আমি প্রত্যেক মানবদেহরূপ মন্দিরে আসীন ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে পারব, যে-মুহূর্তে আমি প্রত্যেক মানুষের সামনে শ্রদ্ধা সহকারে দাঁড়াতে পারব, আর বাস্তবে তার মধ্যে ঈশ্বরকে দেখব, যে-মুহূর্তে আমার ভেতরে এই ভাব আসবে, সেই মুহূর্তেই আমি সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত হব—অন্য সব-কিছুই অদৃশ্য হবে, আমি মুক্ত হব।



Foot Note: