Chapter (অধ্যায়): আত্মা তার বন্ধন ও মুক্তি পৃষ্ঠা - ২৪১Page: 241 of 389
মানুষ যে পশু থেকে উৎপন্ন হয়েছে, তা এই দেশের জনসাধারণের কাছে অতি বীভৎস বলে বোধ হয়। কেন? এই-সকল লক্ষ লক্ষ পশুর শেষ গতি কি? তারা কি কিছুই নয় ? আমাদের যদি আত্মা থাকে, তাহলে তাদেরও তো আত্মা আছে; তাদের যদি আত্মা না থাকে, আমাদেরও আত্মা নেই । কেবল মানুষেরই আত্মা আছে, পশুর নেই —এটা বলা অতি অযৌক্তিক। পশুর অধম মানুষও আমি দেখেছি।
মানুষের আত্মা সংস্কার অনুসারে নিম্ন থেকে উচ্চতর শরীরে পরিভ্রমণ করেছে। কিন্তু কেবল উচ্চতম মনুষ্যশরীরেই তার মুক্তিলাভ হয়। এই মনুষ্য-আকার, এমন কি দেবদূতের আকার অপেক্ষাও উচ্চতর, সকল প্রকার জীব থেকে উচ্চ মানুষই মৃথিবীর মহত্তম জীব, কারণ মানুষই মোক্ষলাভ করে।
এই সমগ্র জগৎ ব্রহ্মেই অবস্থিত ছিল, এবং যেন তা থেকে বাহির হয়ে এসেছে। এরূপে যে-উৎস থেকে জগৎ বাহির হয়ে এসেছে, সেইখানে প্রত্যাবর্তন করবার জন্যই চেষ্টা করছে যেরূপ ডায়নামো (dynamo) হিতে উৎপন্ন হয়ে বিদ্যুৎ একটি বৃত্ত (circuit)সম্পূর্ণ করে ডায়নামোতেই প্রত্যবর্তন করে। আত্মার ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। ব্রহ্ম থেকে বাহির হয়ে আত্মা বিবিধ উদ্ভিদ্ ও পশুর মধ্যে দিয়ে অবশেষে মনুষ্যশরীরে উপস্থিত হয়; এবং মানবই ব্রহ্মের নিকটতম। যে ব্রহ্ম থেকে আমরা হয়ে এসেছি, তাতে ফিরে যাওয়াই মহান জীবন-সংগ্রাম। মানুষ এটা জানুক বা না জানুক, তাতে কিছুই আসে যায় না। পৃথিবীতে আমরা যা কিছু গতিময় দেখি, খনিজ পদার্থে, বৃক্ষ-লতায় অথবা পজশুপক্ষীতে যা কিছু সংগ্রাম দেখি, সবই সেই এক কেন্দ্রস্থলে প্রত্যাবর্তন করে বিশ্রামলাভের প্রচেষ্টা মাত্র। পূর্বে সাম্যাবস্থা ছিল, পরে তা বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে; এবং সকল অংশ—অণু-পরমাণু সেই বিনষ্ট সাম্যাবস্থা পুনঃপ্রাপ্তির জন্য চেষ্টা করছে। এই সংগ্রামে তারা সকল অত্যাশ্চর্য বস্তুর উদ্ভব হয়েছে । প্রাণিজগতে, উদ্ভিদ্জগতে এবং অন্যান্য সকল ক্ষেত্রেই সকল সংগ্রাম ও প্রতিযোগিতা, সকল সামাজিক সংঘর্ষ ও যুদ্ধ, সেই সাম্যাবস্থা পুনঃপ্রাপ্তির জন্য শাশ্বত সংগ্রাম ভিন্ন অপর কিছুই নয় ।
জন্ম থেকে মৃত্যুর দিকে এই গতি—এরূপ বিচরণকেই সংস্কৃতে বলা হয় 'সংসার'; আক্ষরিক অর্থে বলা হয়—জন্ম-মরণ-চক্র। সকল সৃষ্ট বস্তুই এই চক্র পরিক্রমণ করে শীঘ্র বা বিলম্বে মোক্ষলাভ করবে । প্রশ্ন থেকে পারে, যদি আমরা সকলেই ভবিষ্যতে মুক্তিলাভে অধিকারী হই, তাহলে তার জন্য আবার সংগ্রামের প্রয়োজন কি? যদি প্রত্যেকেই মুক্ত হবে, তা হলে আমরা বসে থাকব এবং অপেক্ষা করব। এটা সত্য যে, শীঘ্র হক বা বিলম্বেই হক, প্রত্যেক জীবই মুক্তিলাভ করবে । কেউই পিছনে পড়ে থাকবে না; কারোর ধ্বংস হবে না;

