Chapter (অধ্যায়): মানুষের যথার্থ স্বরূপ (১) পৃষ্ঠা - ২৬Page: 26 of 389


সহানুভূতির ভাব থেকেই এরকম হয়ে থাকে। অতি কঠোর অন্তঃকরণও কখনো কখনো অন্য কারোর প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ে থাকে। এমন কি এই আপাতপ্রতীয়মান ‘অহং’ আসলে ভুলমাত্র, এই ভুল ‘অহং’-এ আসক্ত থাকা অতি নীচ কাজ—যে ব্যক্তি এই-সব কথা শুনলে ভয় পায়, সেই ব্যক্তিই তোমাকে বলবে, সম্পূর্ণ আত্মত্যাগই সব নীতির ভিত্তি। কিন্তু পূর্ণ আত্মত্যাগ হলে কি অবশিষ্ট থাকে? আত্মত্যাগ অর্থে এই আপাতপ্রতীয়মান ‘অহং’-এর ত্যাগ, সবরকমের স্বার্থপরতা-বর্জন। এই অহঙ্কার ও মমতা আগে কুসংস্কারের ফলস্বরূপ, আর যতই এই ‘অহং’ ত্যাগ হতে থাকে, ততই আত্মা নিত্যস্বরূপে নিজের পূর্ণ মহিমায় প্রকাশিত হন। এটাই আসল আত্মত্যাগ, এটাই সমগ্র নীতিশিক্ষার ভিত্তিস্বরূপ—কেন্দ্রস্বরূপ। মানুষ তা জানুক আর নাই জানুক, সমগ্র জগৎ সেই দিকে ধীরে ধীরে চলেছে, অল্প পরিমানে তাই অভ্যাস করছে। কেবল অধিকাংশ লোক তা না জেনে করে থাকে। তারা তা জেনে করুক। এই ‘আমি’ ও ‘আমার’ আসল আত্মা নয়—এটা জেনে তারা এই ত্যাগ আচরন করুক। এই ব্যাবহারিক জীব সীমাবদ্ধ। এখন যাকে মানুষ বলা যাচ্ছে, সে সেই জগতের অতীত অনন্ত সত্তার সামান্য আভাস মাত্র, সেই সর্বস্বরূপ অনন্ত আগুনর একটা স্ফুলিঙ্গমাত্র। কিন্তু সেই অনন্তই তার আসল স্বরূপ।

এই জ্ঞানের ফল—এই জ্ঞানের উপকারিতা কি? আজকাল সব বিষয়ই এই ফল—এই উপকার দেখেই পরিমাণ করা হয়। অর্থাৎ মোট কথা এই—তাতে কত টাকা, কত আনা, কত পয়সা হয়। লোকের এরকম জিজ্ঞাসা করার কি অধিকার আছে? সত্য কি উপকার বা অর্থের মাপকাঠি নিয়ে বিচারিত হবে? মনে কর, তাতে কোন উপকার নেই, তা কি কম সত্য হয়ে যাবে? উপকার বা প্রয়োজন সত্যের নির্ণায়ক হতে পারে না।১ যা হোক, এই জ্ঞানে মহৎ উপকার এবং প্রয়োজন আছে। আমরা দেখছি সকলেই সুখের অনুসন্ধান করছে, কিন্তু অধিকাংশ লোক নশ্বর মিথ্যা বস্তুতে তা অনুসন্ধান করে থাকে। ইন্দ্রিয়ে কেউ কখনোও সুখ পায় না। সুখ কেবল আত্মাতেই পাওয়া যায়। অতএব এই আত্মাতে সুখলাভ করাই মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজন। আর এককথা এই যে, অবিদ্যাই সব দুঃখের প্রসূতি এবং মূল অজ্ঞান এই যে, আমরা মনে করি সেই অনন্ত স্বরূপ যিনি, তিনি নিজেকে সন্ত মনে করে কাঁদছেন ; সমস্ত অজ্ঞানের মূলভিত্তি এই যে, অবিনাশী নিত্যশুদ্ধ পূর্ণ আত্মা হয়েও আমরা ভাবি যে, আমরা ছোট ছোট মন, ছোট ছোট দেহমাত্র ; এটাই সমগ্র স্বার্থপরতার মূল। যখনই আমি নিজেকে একটা ছোট দেহ বলে মনে করি, তখনই—জগতের অন্যান্য শরীরের সুখদুঃখের দিকে না চেয়ে আমি দেহটিকে রক্ষা করতে এবং তার সৌন্দর্য সম্পাদন করতে ইচ্ছা করি। তখন তুমি ও আমি



Foot Note:

১ Bentham’s Utilitarianism and James’ Pragmatism