Chapter (অধ্যায়): সুবিদিত রহস্য পৃষ্ঠা - ২৮৯Page: 289 of 389
করতে পারি। কিন্তু কয়কটি বাসনা আমরা পূর্ণ করতে পারি? আমাদের দেহ অপটু, বহিঃপ্রকৃতি ইচ্ছার প্রতিকূল, আমরা দুর্বল। কিন্তু এখানে শেষ নয়, আমাদের আর একটি দিক আছে। ক্ষুদ্র ফুলটি কিংবা সূক্ষ্ম বলকণাটি যেমন একাধারে সসীম ও অসীমের দ্যোতক, আমাদের স্বরূপও সেইরূপ। আমরা সমু্দ্রের তরঙ্গের মতো। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে তরঙ্গটি সমুদ্র ভিন্ন আর কিছু নয়, আবার অন্য দিক দিয়ে বিচার করলে তরঙ্গ এবং সমুদ্রের পার্থক্য স্পষ্ট। তরঙ্গের এমন কোন অংশ নেই , যাকে লক্ষ্য করে বলা যায় না যে, এটা সমুদ্রই। 'সমুদ্র' নামটি শুধু তরঙ্গ সম্বন্ধে নয় , সমুদ্রের সকল অংশ সম্বন্ধেই প্রযোজ্য, তথাপি সমুদ্র তরঙ্গ থেকে পৃথক্। সত্তারূপ বিরাট সমুদ্রের মধ্যে আমরা এক-একটি ক্ষুদ্র তরঙ্গের মতো; কিন্তু আমরা যখন আমাদের যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করতে যাই, তখন আমরা বুঝতে পারি, আমাদের সত্তাকে ধরা সম্ভব নয়, কারণ আমরা অসীম হয়ে পড়েছি।
আমরা যেন স্বপ্নে বিচরণ করছি। যতক্ষণ মন স্বপ্নাবস্থায় থাকে, ততক্ষণ কিছুই অস্বাভাবিক মনে হয় না, কিন্তু যখনই স্বপ্নের বিষয়কে বাস্তব বলে আঁকড়িয়া ধরবার চেষ্টা করা হয়, তখনই ওটা অদৃশ্য হয়। কেন?—স্বপ্ন মিথ্যা বলে নয়, স্বপ্নের স্বরূপ আমাদের যুক্তি বিচার ও বুদ্ধির অগোচর বলে । জীবনে অনুভূত প্রত্যেকটি বস্তু এত বিরাট যে, তার তুলনায় আমাদের বুদ্ধি অতি তুচ্ছ। বুদ্ধি চায় নিজের উদ্ভাবিত কতকগুলি নিয়মের মধ্যে বস্তুকে রুদ্ধ করে রাখতে, কিন্তু বস্তু কখনও বুদ্ধির নিগড়ে আবদ্ধ থেকে স্বীকৃত হয় না। বস্তুকে নিয়মের জালে আবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বুদ্ধির এই প্রচেষ্টা মানবাত্মার ক্ষেত্রে আরও সহস্রগুণ ব্যর্থ বলে প্রতীত হয়। বস্তুত বিশ্বের সকল পদার্থের মধ্যে 'আমরা নিজেরাই' সর্বাধিক রহস্যময়।
সব কিছুই বিস্ময়কর! মানুষের চোখের দিকে তাকাও! কত সহজে এটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অথচ তোমার চোখ দেখছে বলেই প্রকাণ্ড সূর্যের অস্তিত্ব। সেই রহস্যের কথা ভাবো! ক্ষুদ্র অসহায় চোখ-দুটি! একটা তীব্র আলোক কিংবা একটা কাঁটা চোখ-দুটিকে নষ্ট করে দিতে পারে। তবু সবচেয়ে শক্তিশালী ধ্বংসকারী যন্ত্র, প্রলয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মহাবিস্ময়কর চন্দ্র সূর্য তারকা পৃথিবী প্রভৃতির অস্তিত্ব এই দুইটি ক্ষুদ্র চোখের উপর নির্ভর করে! তোমার চোখই বিশ্বের অস্তিত্বের সাক্ষী। চোখ বলে, 'এই তো বিরাট বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রকৃতি সম্মুখে রয়েছে '; আমরা চোখের সাক্ষ্যে বিশ্বাস করে প্রকৃতির বিচিত্র রূপের অস্তিত্ব স্বীকার করি। এইভাবে ক্ষুদ্র কান, নাক, জিভ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আমরা বিপুল বিশ্বের পরিচয় লাভ করি।
কিন্তু বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে কে ক্ষুদ্র, কে মহৎ, কে দুর্বল, কে সবল, কে উচ্চ, কে নীচ—তা নিশ্চয় করে বলার উপায় নেই , কারণ এই বিশ্বের যাবতীয় পদার্থের পরস্পর-নির্ভরশীলতা এমন অদ্ভুত যে, ক্ষুদ্রতম পরমাণুটির সত্তাও সমগ্র জগতের অস্তিত্বের পক্ষে অত্যাবশ্যক। কেউ ই ছোট নয়, কেউ ই বড় নয়। সব কিছুই এক

