Chapter (অধ্যায়): মানুষের যথার্থ স্বরূপ (১) পৃষ্ঠা - ২৯Page: 29 of 389


শিকার-অন্বেষণে সেখানে উপস্থিত হল, কিন্তু সে দেখেই আশ্চর্য হল যে, ওই মেষদলের মধ্যে একটা সিংহ রয়েছে, আর সে মেষধর্মী হয়ে বিপদের সম্ভাবনা-মাত্রেই পালিয়ে যাচ্ছে। সিংহ তার কাছে গিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল যে, সে সিংহ, মেষ নয়; কিন্তু যেমনি সে এগোনোর হয়, অমনি মেষপাল পালিয়ে যায়—তাদের সঙ্গে মেষ-সিংহটিও পালায়। যা হোক, ওই সিংহ মেষ-সিংহটিকে তার যথার্থ স্বরূপ বুঝিয়ে দেওয়ার সঙ্কল্প ত্যাগ করল না। সে ওই মেষ-সিংহটি কোথায় থাকে, কি করে, লক্ষ্য করতে লাগলো। একদিন দেখল, সে এক জায়গায় পড়ে ঘুমাচ্ছে; দেখেই সে তার উপর লাফিয়ে পড়ে বলল, ‘ওহে, তুমি মেষপালের সঙ্গে থেকে নিজের স্বভাব ভুললে কেন? তুমি তো মেষ নও, তুমি যে সিংহ।’ মেষ-সিংহটি বলে উঠল, ‘কি বলছ, আমি যে মেষ, সিংহ হব কিভাবে?’ সে কোনমতে বিশ্বাস করবে না যে, সে সিংহ, বরং সে মেষের মত চিৎকার করতে লাগলো। সিংহ তাকে টেনে একটা হ্রদের দিকে নিয়ে গেল, বলল, ‘এই দেখ তোমার প্রতিবিম্ব, এই দেখ আমার প্রতিবিম্ব।’ তখন সে সেই দুটোর তুলনা করতে লাগলো। সে একবার সেই সিংহের দিকে, একবার নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে দেখতে লাগলো। মুহূর্তের মধ্যে তার এই জ্ঞানোদয় হল যে, সত্যিই তো আমি সিংহ। তখন সে সিংহ-গর্জন করতে লাগলো, তার মেষবৎ চীৎকার কোথায় চলে গেল! তোমরা সিংহ-স্বরূপ—তোমরা আত্মা, শুদ্ধস্বরূপ অনন্ত ও পূর্ণ। জগতের মহাশক্তি তোমাদের ভিতর। ‘হে বন্ধু, কেন কাঁদছ? জন্ম-মৃত্যু তোমার না, আমারও না। কেন কাঁদতেছ? তোমার রোগ-দুঃখ কিছুই না; তুমি অনন্ত-আকাশস্বরূপ, নানাবর্ণের মেঘ তার উপর আসছে, এক মুহূর্ত খেলা করে আবার কোথায় অন্তর্হিত হয়েছে; কিন্তু আকাশ যে নীলবর্ণ, সেই নীলবর্ণই রয়েছে।’ এরকম জ্ঞানের অভ্যাস করতে হবে। আমরা জগতে অসৎ-ভাব দেখি কেন? কারণ আমরা নিজেরাই অসৎ। পথের ধারে একটা স্থাণু রয়েছে। একটা চোর সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল, সে ভাবল—এ একজন পাহারাওয়ালা। নায়ক তাকে তার নায়িকা ভাবল। একটা শিশু তাকে দেখে ভূত মনে করে চীৎকার করতে লাগলো। ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি এভাবে তাকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেখলেও তা সেই স্থাণু—শুষ্ক কাঠের টুকরো বাদে আর কিছুই ছিল না।

আমারা নিজেরা যেমন, জগতেরও সেরকম দেখে থাকি। মনে কর ঘরে একটা শিশু আছে, এবং টেবিলের উপর এক থলে মোহর রয়েছে। একজন চোর এসে স্বর্নমুদ্রাগুলো গ্রহণ করল। শিশুটি কি বুঝতে পারবে—তা চুরি হল? আমাদের ভিতরে যা, বাইরেও তাই দেখে থাকি। শিশুটির মনে চোর না, সুতরাং সে বাইরেও চোর দেখে না। সব জ্ঞান সম্বন্ধে এরকম। জগতের পাপ-অত্যাচারের কথা বোলো না। বরং তোমাকে যে জগতে এখনও পাপ দেখতে হয়েছে, সেজন্য কাঁদো। নিজে কাঁদো যে তোমাকে এখনও সব জায়গায় পাপ দেখতে হয়েছে।



Foot Note: