Chapter (অধ্যায়): জ্ঞানযোগ—কথা পৃষ্ঠা - ৩১৮Page: 318 of 389


আপনারা দুইজনি অবশ্য স্পঞ্জ দেখেছেন এবং আমি যা-বিষয় বুঝাতে যাচ্ছি , তা নিশ্চয় বুঝবেন। এই স্পঞ্জ-পাহাড় সাগরের অধিকাংশ জল শোষণ করে  নিলেই ভাঁটার উৎপত্তি হয়; ক্রমে দেবগণ নামিয়ে এসে  ঐ পর্বতের উপর নৃত্য আরম্ভ করলে তাদের দেহের ভারে নিষ্পেষিত হয়ে জল বাইর হয়ে  গেলেই জোয়ারের উৎপত্তি হয়। মহাশয়গণ, এই তো জোয়ার-ভাঁটার কারণ; এই কারণ কেমন সরল ও যুক্তিসঙ্গত, তা সহজেই বুঝতে পারবেন। চন্দ্রের আকর্ষণে জোয়ার-ভাটা হয় শুনে যারা ঠাট্টা করেছিলেন, স্পঞ্জ-পাহাড় ও তার উপরে দেবতাদের নৃত্যের বিষয় শ্রবণ করে  তাদের  আর কোন অবিশ্বাস রইল না। দেবতা তো তাদের  নিত্য-বিশ্বাস সত্য বস্তু, আর স্পঞ্জ তারা  স্বচক্ষেই দেখিয়েছেন। উভয়ের মিলিত ক্রিয়াফলেই যে জোয়ার-ভাঁটা হয়ে  থাকে, এটা  খুবই সম্ভব।

     'আরাম'—সত্যলাভের পরীক্ষা নয়; বস্তুত সত্যলাভ এর  ঠিক বিপরীত অবস্থা। যদি কেউ  প্রকৃতপক্ষে সত্যকে জানতে চান, তিনি   যেন আরামে আসক্ত না হন। সমস্ত সুখভোগের কামনা পরিত্যাগ করা কঠিন, কিন্তু জ্ঞানীকে এটা  বর্জন করতে  হবে। জ্ঞানী বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে সব বাসনা ত্যাগ করবেন, তার  দেহাত্মবুদ্ধি থাকবে না—কেবল তখনই উচ্চতর সত্য তার  হৃদয়ে উদ্ভাসিত হইবে। ত্যাগের প্রয়োজন। যজ্ঞ যে ধর্মের অঙ্গ বলে গণ্য হয়েছে, তা এই ক্ষুদ্র স্বার্থগুলির বিসর্জনের অন্তর্নিহিত শক্তি থেকেই হয়েছে। মিথ্যা অহংভাবের বিসর্জন দ্বারা আমরা উচ্চতর 'অহং'-জ্ঞান অর্থাৎ আত্মানুভূতি লাভ করতে  পারি। দেবতাদের ক্রোধের উপশমের বা প্রসন্নতার জন্য যে যথার্থ ফলপ্রদ বলি প্রদত্ত হত, তা  আত্মজ্ঞান-লাভের উপায় কাঁচা 'আমি'র বিসর্জনেরই রূপক মাত্র। জ্ঞানী দেহরক্ষার জন্য যত্ন করবেন না, মনেও ঐ ইচ্ছা পোষণ করবেন না। বিশ্বের ধ্বংস হলে ও জ্ঞানী সাহসের সঙ্গে সত্য অনুসরণ করবেন। যারা অলীক উত্তেজনার পশ্চাতে ধাবিত হয়, তারা সত্য অনুসরণ করতে পারে না। শুধু এই জীবনে নয়, শত শত জীবন ধরে  এই সাধনা করতে  হবে। অতি অল্পসংখ্যক মানুষই অন্তরে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে  সাহস করে—স্বর্গসুখ, সাকার ঈশ্বর-উপাসনা ও ফলাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন করতে  সাহসী হয়। এই জ্ঞানের সাধনের জন্য দৃঢ় সঙ্কল্প আবশ্যক; সন্দেহে দোদুল্যমান হওয়াও অত্যন্ত দুর্বলতার লক্ষণ। মানুষ নিত্য-পূর্ণই আছে, তা  না হলে  কিরূপে পূর্ণত্ব লাভ করতে  সমর্থ হত? কিন্তু তাকে এই পূর্ণত্ব প্রত্যক্ষ করতে  হয়েছিল। মানুষ যদি শুধু বাহ্য কারণগুলির অধীন থাকত, তা হলে  সে কেবল মরণশীলই থেকে  যেত। যারা কোন অবস্থার উপর নির্ভর-শীল নয়, তাদের  সম্বন্ধেই অমৃতত্ব প্রযোজ্য। আত্মাকে কোন কিছু প্রভাবিত করতে  পারে না—এই ভাব সম্পূর্ণ ভ্রান্তিমূলক; কিন্তু মানুষকে আত্মার সঙ্গে এক থেকে  হবে , দেহ বা মনের সঙ্গে নয়। মানুষ এই জগতের দ্রষ্টামাত্র—এই সত্য সে জানতে পারলেই নিয়ত গতিশীল এই



Foot Note: