Chapter (অধ্যায়): মায়া ও ঈশ্বর-ধারণার ক্রমবিকাশ পৃষ্ঠা - ৫০Page: 50 of 389
পারে। আমি যে কারণে সেই কাজ করতে প্রবৃত্ত হয়ে থাকি, তিনি সেই কাজ অন্য উদ্দেশ্যে করতে পারেন। সুতরাং ওইসব প্রচীন ধর্ম বিচার করার সময় আমরা যেমন আমাদের মানসিক প্রবণতা দ্বারা বিচার না করি; আমরা যেমন সেই প্রাচীনকালের জীবন ও চিন্তাধারার ভাবে নিজেদেরকে ভাবিত করে বিচার করি।
ওল্ড টেস্টামেন্টের নিষ্ঠুর জিহোভার বর্ণনায় অনেকে ভীত হয়; কিন্তু কেন? লোকের এরকম কল্পনা করার কি অধিকার আছে যে, প্রাচীন ইহুদিদের জিহোভা আজকালকার ঈশ্বরের মতো হবেন? আবার আমাদের বিস্মৃত হওয়া উচিত নয় যে, আমরা যে ভাবে প্রাচীনদের ধর্ম বা ঈশ্বরের ধারণায় হেসে থাকি, আমাদের পরে যারা আসবেন তাঁরা আমাদের ধর্ম বা ঈশ্বরের ধারণাগুলোকেও সেইভাবে উপহাস করবেন। তা হলেও এই-সব বিভিন্ন ঈশ্বর-ধারণার মধ্যে সংযোগসাধক একটা সুবর্ণ-সূত্র বিদ্যমান, আর বেদান্তের উদ্দেশ্য—সেই সূত্র আবিষ্কার করা। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—‘ভিন্ন ভিন্ন মণি যেমন এ সূত্রে প্রকাশিত, সেরকম এই-সব বিভিন্ন ভাবের ভিতরেও একটা সূত্র রয়েছে।’ আর আধুনিক ধারণানুসারে সেগুলো যতই বীভৎস ভয়ানক বা ঘৃণিত বলে মনে হোক না কেন, বেদান্তের কর্তব্য—ওই-সব ধারণা ও উপস্থিত ধারণাগুলোর ভিতর এই যোগসূত্র আবিষ্কার করা। অতীতকালের পটভূমিকায় সেগুলো বেশ সঙ্গতই ছিল, আমাদের উপস্থিত ভাব ও ধারণা হতে সেগুলো বেশী বীভৎস ছিল না। যখন আমরা প্রাচীন পারবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেই ভাবগুলোকে দেখতে যাই , তখনই শুধু ওইগুলোর বীভৎসতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। প্রাচীন পারবেশ এখন তো আর নেই। যেমন প্রাচীন ইহু্দী উপস্থিত তীক্ষ্মবুদ্ধি ইহু্দীতে পরিণত হয়েছেন, যেমন প্রাচীন আর্যেরা আধুনিক বুদ্ধিমান হিন্দুতে পরিণত হয়েছেন, সেরকম জিহোভার ক্রমোন্নতি হয়েছে, দেবতাদেরও হয়েছে। আমরা এইটুকু ভুল করি যে, আমরা উপাসকের ক্রমোন্নতি স্বীকার করে থাকি, কিন্তু উপাস্যের ক্রমোন্নতি স্বীকার করি না। উন্নতির জন্য উপাসকদেরকে আমরা যেটুকু প্রশংসা করি , উপাস্য ঈশ্বরকে সেটুকু করি না । কথাটা এই—তুমি আমি যেমন কোন বিশেষ ভাবের প্রকাশক বলে ওই ভাবের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তোমার আমার উন্নতি হয়েছে, সেরকম দেবতারাও বিশেষ বিশেষ ভাবের দ্যোতক বলে ভাবের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁদেরও উন্নতি হয়েছে। তোমাদের আশ্চর্য মনে হতে পারে যে, দেবতা বা ঈশ্বরের ও উন্নতি হয়! তোমাদের ভাব—ঈশ্বরের উন্নতি হয় না, তিনি অপরিবর্তনীয়। এইভাবে তো এটাও বলা যায় যে, আসল মানুষেরও কখনো উন্নতি হয় না। আমরা পরে দেখব—এই মানুষের ভিতর যে আসল মানুষ রয়েছেন, তিনি অচল অপরিণামী শুদ্ধ ও নিত্যমুক্ত। যেমন এই মানুষ সেই আসল মানুষের ছায়ামাত্র, সেরকম আমাদের ঈশ্বর-ধারণা আমাদের মনেরই সৃষ্টি; তা সেই আসল ঈশ্বরের আংশিক প্রকাশ- আভাসমাত্র।
১ গীতা, ৭।৭

