Chapter (অধ্যায়): মায়া পৃষ্ঠা - ৬Page: 6 of 389
আমাদের বুদ্ধি জ্ঞান ও জীবনের প্রতি ঘটনার মধ্যে সব জায়গায়ই এই বিষম বিরুদ্ধভাব রয়েছে। একজন সংস্কারক আবির্ভূত হয়ে জাতি-বিশেষের দোষ প্রতিকার করার জন্য যত্নবান্ হলেন; প্রতিকারের আগেই অপর দিকে অন্য হাজারপ্রকার দোষ দেখা দিল। এ যেমন পতনোন্মুখ অট্টালিকার মতো, এক জায়গায় জীর্ণসংস্কার করতে করতে অপরদিকে ভাঙন ধরে। ভারতীয় নারীগণের বাধ্যতামূলক বৈধব্য-জনিত দুঃখ প্রতিকারের জন্য আমাদের সংস্কারকরা প্রচার করছেন। পাশ্চাত্যে বিয়ে না হওয়াই প্রধান দোষ। একজায়গায় কুমারীদের সাহায্য করতে হবে, তারা দু্ঃখ পাচ্ছে ; অন্য জায়গায় বিধবাদের সাহায্য করতে হবে, তারা কষ্ট পাচ্ছে। দেহের পুরনো বাতব্যাধির মতো মাথা থেকে দূর হয়ে এটা শরীরের অন্য জায়গা আশ্রয় করছে; আবার সেখান থেকে পাদদেশ আক্রমন করছে। সংস্কারক এসে সাধারনের মধ্যে প্রচার করলেন-বিদ্যা ধন কৃষি কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তারা এগুলো সকলের আয়ত্তের মধ্যে আনার চেষ্টা করলেন। এটাতে কেউ কেউ এক হিসেবে কিছুটা সুখী হল ঠিকই, কিন্তু জ্ঞানানুশীলন যতই বেশী হতে লাগলো, শারীরিক সুখ ততই হয়তো অন্তর্হিত হতে লাগলো। এখন সুখের জ্ঞান থেকেই যে দুঃখের জ্ঞান আসছে! কোন পথে যাব? আমরা যে সামান্য সুখ ভোগ করছি, অন্য কোথাও সেই পরিমাণ দুঃখ উৎপন্ন হয়েছে। এটাই নিয়ম। যুবকেরা হয়তো এটা স্পষ্ট বুঝতে পারবে না। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন বেঁচে আছেন, অনেক যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, তাঁরা এটা উপলব্ধি করতে পারবেন। এটাই মায়া।
দিনরাত এইসব ব্যপার ঘটছে, কিন্তু এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব। এরকম হবার কারণ কি? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অসম্ভব। কারণ প্রশ্নটি যুক্তিসঙ্গতভাবে উথ্থাপিতই হতে পারে না; যা ঘটছে তার না আছে ‘কেন’, না আছে ‘কি ভাবে’ ; আমরা শুধু জানি এটা ঘটছে, আমরা
আর কিছুই করতে পারি না। আমরা এটাকে এক মুহূর্তও স্থির রাখতে পারি না-প্রতি মুহূর্তে এটা আমাদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কি ভাবে আমরা এ সমস্যার সমাধান করবো-আমরা যে কখনো কখনো নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছি পরোপকারের চেষ্টা করেছি সেগুলো মনে করে ভাবতে পারি- কেন, ওই কাজগুলো তো আমরা বুঝে-সুঝে ভেবে-চিন্তে করেছিলাম, কিন্তু আসলে আমরা সেগুলো না করে থাকতে পারি না বলেই এরকম করেছিলাম। আমাকে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বক্তৃ্তা দিতে হয়েছে আর আপনাদেরকে বসে তা শুনতে হয়েছে-এটাও আমরা না করে থাকতে পারি না বলেই করছি। আপনারা ঘরে ফিরে যাবেন, হয়তো কেউ এটা থেকে সামান্য শিক্ষালাভ করবেন, অন্য কেউ হয়তো মনে করবেন লোকটা অনর্থক বকছে। আমি বাড়ি গিয়ে ভাবব, আমি বক্তৃতা দিয়েছি। এটাই মায়া।

