Chapter (অধ্যায়): মায়া ও মুক্তি পৃষ্ঠা - ৬৪Page: 64 of 389
বলে মনে হয়, যখন আশা ভঙ্গ হতে থাকে, যখন মানুষের নিজের শক্তির উপর বিশ্বাস চূর্ণ হয়ে যায়, যখন সবই যেমন তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যায় এবং জীবন একটা ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়, তখন সে এই বাণী শুনতে পায়। আর এটাই ধর্ম।
অতএব, একদিকে এই অভয়বানী, এই আশাপ্রদ বাক্য যে, এ-সব কিছুই নয়, এ-সবই মায়া, এটা উপলব্ধি কর, কিন্তু, সেই সঙ্গে এই আশার বাণী যে, মায়ার বাইরে যাওয়ার পথ আছে। অপর দিকে, সাংসারিক বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের বলেন—‘ধর্ম, দর্শন এ-সব বাজে জিনিস নিয়ে মাথা ঘামিও না। সংসারে বাস কর; এই সংসার নিতান্ত অশুভপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু যতদূর পারো, এটার সদ্ব্যবহার করে নাও।’ সাদা কথায় এটার অর্থ এই, দিনরাত ভণ্ডামি, মিথ্যাচার ও প্রতারণার জীবন যাপন কর—তোমার ক্ষতগুলো যতদূর পারো ঢেকে রাখো। তালির উপর তালি দাও, শেষে আসল জিনিসটিই যেমন নষ্ট হয়ে যায়, আর তুমি কেবল একটা জোড়াতালির সমষ্টিতে পরিণত হও। এটাকেই বলে—সাংসারিক জীবন। যারা এরকম জোরাতালি নিয়ে সন্তুষ্ট, তারা কখনো ধর্মালাভ করতে পারবে না! যখন জীবনের উপস্থিত অবস্থায় ভয়ানক অশান্তি উপস্থিত হয়, যখন নিজের জীবনের উপরও আর মমতা থাকে না, যখন এরকম ‘তালি’ দেওয়ার উপর ভয়ানক ঘৃণা উপস্থিত হয়, যখন মিথ্যা ও প্রবঞ্চনার উপর ভয়ানক বিতৃষ্ণা জন্মায়, তখনই ধর্মের আরম্ভ। বুদ্ধদেব বোধিগাছের নিম্নে বসে দৃঢ়স্বরে যা বলেছেন, সে কথা যে প্রাণ থেকে বলতে পারে, সেই কেবল ধার্মিক হবার যোগ্য। সংসারী হবার ইচ্ছা তাঁরও মনে একবার এসেছিল। তখন তাঁর এই অবস্থা : তিনি স্পষ্ট বুঝছেন, এই সাংসারিক জীবনটা একেবারে ভুল; অথচ এটা থেকে বাইরে যাওয়ার কোন পথ আবিষ্কার করতে পারছেন না। প্রলোভন একবার তাঁর কাছে আবির্ভূত হয়েছিল; সে যেমন বলল—সত্যের অনুসন্ধান পরিত্যাগ কর, সংসারে ফিরে গিয়ে আগেকার মতো প্রতারণাপূর্ন জীবন যাপন কর, সব জিনিসকে তার ভুল নামে ডাকো, নিজের কাছে ও সকলের কাছে দিনরাত মিথ্যা বলতে থাকো। কিন্তু সেই মহাবীর অতুল বিক্রমে তক্ষুনি তাকে জয় করে ফেললেন; তিনি বললেন—‘কেবল খেয়ে পরে মূর্খের মতো জীবনযাপন অপেক্ষা মৃত্যুও ভালো; পরাজয়ের জীবনযাপন অপেক্ষা যুদ্ধক্ষেত্রে মরা ভালো।’ এটাই ধর্মের ভিত্তি। যখন মানুষ এই ভিত্তির উপর দণ্ডায়মান হয়, তখন সে সত্যিলাভ করার পথে চলেছে, সে ঈশ্বরলাভ করার পথে চলেছে, বুঝতে হবে। ধার্মিক হবার জন্যও প্রথমেই এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা জরুরি আমি নিজের পথ নিজে করে নেব। সত্যি জানবো অথবা এই চেষ্টায় প্রাণ দেবো; কারণ সংসারের দিকে তো আর কিছু পাওয়ার আশা নেই, এটা শূন্য—এটা প্রতিদিন ন্যায় পাচ্ছে। আজকের সুন্দর আশাপূর্ণ তরুণ আগামী কাল বৃদ্ধ। আজকের আশা আনন্দ সুখ—এসব মুকুলের মতো আগামী কাল শিশিরপাতেই নষ্ট হবে। এটা যেমন একদিকের কথা, অপরদিকে তেমনি জয়ের

